সুদের টাকা কি গরিবদের দান করা যাবে? ইসলাম কী বলে?

 


সুদের টাকা কি গরিবদের দান করা যাবে? ইসলাম কী বলে?**

 

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক. 

তারিখ ১৯,০৬.২০






ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুসলমানের খাদ্য, পোশাক, ইবাদত এবং জীবনযাপনের সঙ্গে তার উপার্জনের বৈধতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ কারণেই ইসলাম সুদ (রিবা) সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং এটিকে অন্যতম বড় গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে।


তবে বাস্তব জীবনে অনেক সময় মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে সুদের অর্থ তার হিসাবে জমা হয়। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই সুদের টাকা কি গরিব-দুঃখীদের মধ্যে দান করা যাবে? এতে কি কোনো সওয়াব হবে? নাকি এটাও গুনাহের কাজ? ইসলামী শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি জানা প্রয়োজন।

**ইসলামে সুদের ভয়াবহতা**


আল্লাহ তাআলা বলেন—

**يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ۝ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ**

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যে অংশ অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও। আর যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৮-২৭৯)

এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, সুদ সাধারণ কোনো গুনাহ নয়; বরং এটি এমন একটি অপরাধ, যার বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।

**সুদ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী**

হাদিসে এসেছে—

**لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ**

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, এর লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়—সকলের ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।’ (মুসলিম ১৫৯৮)

এ হাদিস প্রমাণ করে যে, সুদভিত্তিক লেনদেনে ইচ্ছাকৃতভাবে জড়িত হওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

**ব্যাংক থেকে পাওয়া সুদের টাকা কী করা উচিত?**

যদি কোনো ব্যক্তি বাধ্যতামূলক কারণে প্রচলিত ব্যাংকে টাকা রাখেন এবং সেখান থেকে সুদ জমা হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থ নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা বৈধ নয়।

কারণ হারাম সম্পদ ভোগ করা নিষিদ্ধ। তাই ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, এ ধরনের অর্থ গরিব-দুঃখী, অসহায় মানুষ অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে দিতে হবে। তবে এটি দান বা সদকার সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে নয়; বরং হারাম সম্পদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ, এটি প্রকৃতপক্ষে ‘সদকা’ নয়; বরং অবৈধ অর্থ পরিত্যাগ করার একটি পদ্ধতি।

**সুদের টাকা দান করলে কি সওয়াব হবে?**

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সুদের টাকা গরিবদের দিয়ে দিলে কোনো সদকা বা দানের সওয়াব পাওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি শুধুমাত্র পবিত্র সম্পদই গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

**إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا**

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছুই গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ১০১৫)

সুতরাং সুদের অর্থ গরিবকে দেওয়া হবে সমাজকে উপকৃত করা এবং হারাম সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে; নেকি অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়।

**গরিব আত্মীয়কে দেওয়া যাবে কি?**

যদি কোনো আত্মীয় প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত হন, তাহলে সুদের অর্থ তাদের দেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হলো—

এর বিনিময়ে সওয়াবের আশা করা যাবে না।

নিজের ওপর আবশ্যক খরচ বহনকারী ব্যক্তিদের (যেমন: পিতা-মাতা, সন্তান) প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিকল্প হিসেবে দেওয়া যাবে না।

এটি হারাম অর্থ থেকে মুক্ত হওয়ার নিয়তেই দিতে হবে।


**শুধু দান করার উদ্দেশ্যে সুদ নেওয়া কি জায়েজ?**

অনেকেই মনে করেন, ‘আমি তো নিজের জন্য নিচ্ছি না, গরিবকে দিয়ে দেব’— এই নিয়তে সুদী ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ নেওয়া বৈধ হতে পারে। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ সুদের চুক্তিতে প্রবেশ করাই একটি নিষিদ্ধ কাজ। তাই শুধুমাত্র গরিবকে দান করার উদ্দেশ্যে সুদী হিসাব খোলা, এফডিআর করা কিংবা সুদ অর্জনের পরিকল্পনা করা জায়েজ নয়। গুনাহ হবে তখনই, যখন মানুষ জেনে-শুনে সুদভিত্তিক চুক্তিতে অংশগ্রহণ করবে।


**আমাদের করণীয়**

- সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে দূরে থাকা।

- প্রয়োজন ছাড়া সুদী ব্যাংকে হিসাব না খোলা।

- অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রাপ্ত সুদের অর্থ নিজে ভোগ না করা।

- গরিব, অসহায় মানুষ কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে সেই অর্থ ব্যয় করে দেওয়া।

- যাকাত, ফিতরা বা সদকার বিকল্প হিসেবে সুদের অর্থ ব্যবহার না করা।

- শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ ব্যবস্থা বেছে নেওয়া।


ইসলাম মানবজীবনকে হালাল ও পবিত্র উপার্জনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সুদকে ইসলাম কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে সতর্ক করেছে। তাই কোনো মুসলমানের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সুদ অর্জনের চেষ্টা করা বৈধ নয়।

তবে যদি অনিবার্য পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসাবে সুদের অর্থ জমা হয়ে যায়, তাহলে তা নিজের কাজে ব্যবহার না করে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে দিতে হবে। এতে দানের সওয়াব না থাকলেও হারাম সম্পদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। একজন সচেতন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত— শুধু গুনাহ থেকে বাঁচা নয়, বরং নিজের উপার্জন, ভোগ ও ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে হালাল ও পবিত্র রাখা।